নাজমুল হুদা বাশার-
ফরিদপুর
২৯ এপ্রিল ২০২৬ বুধবার
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইজার চুরির অভিযোগ। শহরের ঝিলটুলী এলাকায় চৌরঙ্গী মোড় নামক এলাকায় হতে জনতার হাতে এক অটোচালক আটক হওয়ার পর বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আটক ব্যক্তি রবিউল মিয়া (৫২), বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা। তিনি একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালাতেন। জনতার দাবি, হাসপাতালের সরকারি ডায়ালোসিস ইউনিটে ব্যবহৃত মূল্যবান ডায়ালাইজার অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে সন্দেহজনক অবস্থায় আটক করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশের তৎপরতা
খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এসআই নুর জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে উদ্ধারকৃত মালামালসহ অটোচালককে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার উৎস অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
অটোচালকের জবানবন্দিতে নতুন মোড়
আটক রবিউল মিয়া বলেন-
হাসপাতালের পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলায় দায়িত্বে থাকা সিনিয়র নার্স ইনচার্জ নাদিরা আক্তারের নিচতলার স্টোর রুম থেকে মালামালগুলো সরবরাহ করেন। কয়েকজন চোর চক্রের সহায়তারী।দিন দুপুরে এই ধরনের চুরির
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর হাসপাতালের অভ্যন্তরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্টোর রুমের চাবি ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
সিনিয়র নার্স ইনচার্জ নাদিরা আক্তার সাংবাদিকদের জানান,
স্টোর রুমের চাবি সাধারণত তার কাছেই থাকে। তবে প্রয়োজন হলে তিনি ওয়ার্ডের কর্মচারী মোঃ সালাউদ্দিন ও জহুরুল ইসলাম-এর মাধ্যমে স্টোর থেকে যন্ত্রপাতি আনান।
অন্যদিকে, মোঃ সালাউদ্দিন জানান—
২৯ এপ্রিল দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে তিনি স্টোর থেকে মালামাল এনে পুনরায় তালা লাগিয়ে দেন।
গরমিল ও সন্দেহ
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন—
যদি দুপুরে স্টোর বন্ধ করা হয়, তাহলে বিকেলে কীভাবে মালামাল বের হলো?
স্টোর রুমের চাবি কার নিয়ন্ত্রণে ছিল?
দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ ছাড়া অন্যদের হাতে চাবি দেওয়া কতটা নিয়মসম্মত? সিসি ফুটেজে
অটোচালক ও অপর এক চোর কে একাধিক বার চুপি চুপি কথা বলা এদিক সেদিক খেয়াল করা দেখা গেছে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নীতিমালা অনুযায়ী, স্টোর রুম খোলা, যন্ত্রপাতি বের করা এবং পুনরায় তালাবদ্ধ করার পুরো প্রক্রিয়া ইনচার্জের উপস্থিতিতে হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সেই নিয়ম লঙ্ঘনের ইঙ্গিত স্পষ্ট ভাবেই স্বীকার করেছেন নাদিরা আক্তার।এ ব্যাপারে
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোঃ হুমায়ুন কবির আহমেদ জানিয়েছেন,
ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। রিপোর্ট পরবর্তীতে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ,
এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালের ভেতরে একটি অসাধু চোর চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাইরে পাচার করে। হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের চুরি সম্ভব নয়।
জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা
দরিদ্র রোগীরা যেখানে ডায়ালোসিসের মতো জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন মৃত্যুর পথযাত্রী হয়ে ছটফট করছে,আর কিনা সেখানে সরকারি সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন
“যদি হাসপাতালের ভেতরেই রোগীর জীবন বাঁচানোর সরঞ্জাম নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”
স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর শাস্তি প্রদান করা হলে বার বার এমন হতো না বলে সাধারণ জনগণেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সচেতন মহল জোর দিয়ে বলছেন—
অটোচালকের বক্তব্য যাচাই করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেড়িয়ে আসবে থলের বিড়াল।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের কে আইনের আওতায় আনতে হবে। এব্যাপারে
স্টোর ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়া অডিট করতে হবে।
জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ঘটনা শুধু একটি চুরির অভিযোগ নয়—এটি পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে হাসপাতালের ভেতরের কোনো ব্যক্তি বা চক্র এর সঙ্গে জড়িত, তবে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
জনগণের প্রত্যাশা—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দালালমুক্ত একটি নিরাপদ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ নাজমুল হুদা বাশার ০১৭১১২৫৩৬৭৬
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রেজাউল করিম ০১৭১১৯২৯৪৭৩
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬