রেজাউল করিম, ফরিদপুর
ফরিদপুরের নগরকান্দায় গুজবকে কেন্দ্র করে গণপিটুনিতে নিহত ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৫)-এর বাড়িতে এখন শোকের মাতম। এই নির্মম ঘটনার পর সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছে তার দুই বছর বয়সী কন্যা মুসলিমা ইসলাম—যে জন্মের ২১ দিনের মাথায় মাকে হারায়, আর এখন বাবাকেও হারিয়ে পুরোপুরি এতিম হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামের শহীদ শেখের ছেলে হান্নান শেখ পেশায় একজন ট্রাকচালক ছিলেন এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। শুক্রবার (২ মে) রাতে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া গ্রামের নতুন হাটখোলা এলাকায় একটি সড়ক দুর্ঘটনার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয়রা উত্তেজিত হয়ে সড়ক অবরোধ করে এবং ট্রাক থামিয়ে চালক হান্নান শেখকে বেদম মারধর করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার দুই সহকারী নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে, শনিবার ময়নাতদন্ত শেষে হান্নান শেখের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাড়িতে চলছে শোকের ছায়া, আর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় ছোট্ট মুসলিমাকে ঘিরে। কিছু না বুঝে কখনো দাদির কোলে, কখনো অন্যদের কোলে ঘুরছে সে। কখনো ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ছে। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে পরিবারের।
মুসলিমার দাদি নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“মা জন্মের ২১ দিনেই চলে গেছে। এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি মরে গেলে এই বাচ্চার কী হবে?”
নিহতের বাবা শহীদ শেখ বলেন,
“আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। যদি কোনো অপরাধ করেও থাকে, তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। এখন এই এতিম শিশুর ভবিষ্যৎ কী?”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে একটি দ্রুতগতির ট্রাক পথচারীদের ধাক্কা দিয়েছে। এর জেরে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রাসূল সামদানী আজাদ জানান,
“আমরা নিহতের পরিবারকে হত্যা মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। লাশ দাফনের পর তারা মামলা করবে বলে জানিয়েছে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো ও উসকানিদাতাদের শনাক্তে কাজ চলছে।”
বিচার ও মানবিক সহায়তার দাবিঃ
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি এতিম শিশু মুসলিমার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সরকারি সহায়তা কামনা করেছেন তারা।
অনেকেই মনে করছেন, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শিশুটির দায়িত্ব গ্রহণ, শিক্ষা ও লালন-পালনের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
গুজব প্রতিরোধে সচেতনতার প্রয়োজনঃ
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, গুজব কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
একটি গুজব কেড়ে নিল এক প্রাণ, আর অন্ধকারে ঠেলে দিল এক শিশুর ভবিষ্যৎ—এমন ঘটনা আর যেন না ঘটে, সেই প্রত্যাশাই এখন সবার।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ নাজমুল হুদা বাশার ০১৭১১২৫৩৬৭৬
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ রেজাউল করিম ০১৭১১৯২৯৪৭৩
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬