ফরিদপুর কৃষাণহাটে বোর্ডিংয়ের আড়ালে পতিতাবৃত্তি: অভিযানে আটক ১৯, বিপাকে কৃষক শ্রমিকরা
- আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬ ১০৭ বার পড়া হয়েছে

রেজাউল করিম, ফরিদপুরঃ
ফরিদপুর শহরের কৃষাণহাট এলাকায় শ্রমিকদের থাকার জন্য গড়ে ওঠা বোর্ডিংগুলোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ১৯ জন নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছে। অভিযানের পর একাধিক বোর্ডিং কক্ষ বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা কৃষক শ্রমিকরা।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে শহরের গোয়ালচামট বিদ্যুৎ ভবনের সামনে কৃষাণহাট সংলগ্ন শ্রমিকদের বোর্ডিংগুলোতে এ অভিযান পরিচালনা করেন ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপ্ত চক্রবর্তী ও দেব কুমার পাল।
অভিযানকালে বোর্ডিংয়ের বিভিন্ন কক্ষ থেকে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭ নারী ও ১২ পুরুষকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে যৌন উত্তেজক ওষুধসহ মাদকদ্রব্যও জব্দ করা হয়।
পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ও ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন ধারায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতে পাঠান। তাৎক্ষণিকভাবে আটক ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
অভিযানের পর বিপাকে খেটে খাওয়া শ্রমিকরা
অভিযানের পর কৃষাণহাট এলাকার ৭ থেকে ৮টি বোর্ডিং কক্ষ বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে বিভিন্ন জেলা থেকে কাজের সন্ধানে আসা কৃষক শ্রমিকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক শ্রমিককে রাত কাটাতে হয়েছে খোলা মাঠে ও আকাশের নিচে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে খোলা জায়গায় ঘুমিয়ে থাকা কয়েকজন শ্রমিকের কাছ থেকে বখাটে যুবকেরা টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। এমনকি এক বয়স্ক কৃষক শ্রমিককে মারধর করে চোখের নিচে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যেভাবে গড়ে ওঠে কৃষাণহাট
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কয়েক বছর আগেও কৃষক শ্রমিকরা ফরিদপুর নতুন বাস টার্মিনালের আশপাশে ও বিভিন্ন বারান্দায় রাত কাটাতেন। সেখানে প্রায়ই ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নানা হয়রানির শিকার হতে হতো তাদের।
এই পরিস্থিতিতে বাবু শেখ নামে এক ব্যক্তি কৃষক শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্যোগ নেন। পরে স্থানীয় এক জমির মালিকের কাছ থেকে জায়গা লিজ নিয়ে শ্রমিকদের জন্য বোর্ডিং ব্যবস্থা গড়ে তোলেন তিনি।
সেখানে শ্রমিকদের রাত যাপনের জন্য ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। ধীরে ধীরে এটি কৃষক শ্রমিকদের একটি অস্থায়ী আবাসন ও শ্রমবাজারে রূপ নেয়, যা পরে স্থানীয়ভাবে “কৃষাণহাট” নামে পরিচিতি পায়।
এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা এসে কাজের জন্য অপেক্ষা করতেন। কোনো শ্রমিককে কাজের জন্য নিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট গৃহস্থালির কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেওয়া হতো। সেই অর্থ দিয়ে হাটের দেখভাল করা হতো বলে জানা গেছে।
অভিযোগ: পরে ঢুকে পড়ে অসামাজিক কার্যকলাপ
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরুতে শ্রমিকদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কৃষাণহাট পরিচালিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যক্তি সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে। বিভিন্ন জেলা থেকে নারী এনে অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনার অভিযোগও উঠতে থাকে।
এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নজরে থাকলেও সাম্প্রতিক অভিযানের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
জমির মালিকানা ও ব্যবসা নিয়ে নানা প্রশ্ন
এদিকে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কৃষাণহাটের জায়গাটি প্রথমে শুধু বসবাসের জন্য লিজ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেখানে একাধিক বোর্ডিং ও হোটেল গড়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তীতে জমির মালিকপক্ষ মিজান চৌধুরী বিভিন্ন বোর্ডিং পরিচালকদের কাছ থেকে মোটা অংকের অগ্রিম টাকা নেওয়া শুরু করেন। অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বোর্ডিং বা হোটেল পরিচালনার জন্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হয়েছে এবং মাসিক ভাড়াও তুলনামূলক বেশি নেওয়া হয়।
তাদের অভিযোগ, এলাকায় কী ধরনের কার্যক্রম চলত—তা অনেকেরই জানা থাকলেও বিভিন্ন কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। এসময় এলাকাবাসীরা জানান ফরিদপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় হোটেলে ব্যাবসায়ী হলেন মিজান চৌধুরী তার দালান কোঠায় কি হয় না হয় তাহা তার অজানা কিছু নয় তিনি সব ভালো করেই জেনে শুনেই বেশি টাকার লোভেই দিরঘদিন তিনি বড়ো বড়ো দালান কোঠা উঠিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আবাসিক হোটেল হিসেবে ভাড়া দিয়ে থাকেন
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের কণ্ঠ
কৃষক শ্রমিকদের অনেকেই বলেন, শুরুতে এখানে নিরাপদ পরিবেশ ছিল।
এক শ্রমিক বলেন—
“আগে বাবু ভাই আমাদের ভালোভাবে দেখাশোনা করতেন। শুধু শ্রমিকদের থাকার জন্য যদি বোর্ডিংগুলো চালু থাকতো তাহলে আমরা নিরাপদে থাকতে পারতাম।”
আরেকজন শ্রমিক জানান—
“আমরা এখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে যাই। কোনো গৃহস্থ যদি আমাদের টাকা না দেয়, বাবু ভাইকে জানালে তিনি সেই টাকা আদায় করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের মতে, কৃষাণহাট এলাকার সমস্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িত। তাই অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি।
এলাকাবাসী ও শ্রমিকদের দাবি—
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা হোক এবং একই সঙ্গে কৃষক শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

















