ফরিদপুরে উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন: ১৫ তলা পাঁচতারকা হোটেল থেকে বিশ্বমানের ক্রীড়া ভেন্যু
- আপডেট সময় : ১১:৪৩:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে

নাজমুল হুদা বাশার, নিজস্ব প্রতিবেদক
ফরিদপুরকে আধুনিক, নান্দনিক ও সম্ভাবনাময় একটি জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে একাধিক বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজনের উপযোগী অবকাঠামো, জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে ১৫ তলা ভবন, পাঁচতারকা মানের আবাসন, আধুনিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা, লেকপাড়ে বিনোদনকেন্দ্র এবং জেলা পরিষদের সম্পদ থেকে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমিত বরাদ্দ ও প্রশাসনিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, জেলা পরিষদের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার হয়—এটাই তার মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ফরিদপুর জেলা পরিষদের বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং প্রান্তিক মানুষের সেবা নিয়ে নিজের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের জন্য বড় পরিকল্পনা
ফরিদপুরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলাধুলার আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে মানসম্মত আবাসন সুবিধার ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। এই সমস্যা দূর করতে জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে ১৫ তলা একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আফজাল হোসেন খান পলাশ জানান, প্রস্তাবিত ভবনের নির্মাণের প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসেবে মাটি পরীক্ষা বা সয়েল টেস্টের কাজ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে একটি বেসরকারি কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনের নিচের পাঁচটি তলায় জেলা পরিষদের অফিস, বাণিজ্যিক স্পেস, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও অডিটোরিয়ামসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে। ওপরের তলাগুলোতে গড়ে তোলা হবে উন্নতমানের আবাসন ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক বা জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়, অতিথি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যাতে সেখানে অবস্থান করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই আবাসন সুবিধাটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
লেকপাড়ে আধুনিক পার্ক
ফরিদপুর শহরের মানুষের বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে লেকপাড়ে আধুনিক একটি পার্ক নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে বলেও জানান জেলা পরিষদ প্রশাসক।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২১০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে বরাদ্দ কমিয়ে প্রায় ৮৭ কোটি টাকায় আনা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৬ কোটি টাকার কাজের টেন্ডার হয়েছে এবং প্রকল্পের প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।
আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এটি ফরিদপুরবাসীর অন্যতম বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও পরিবারের সদস্যদের অবসর কাটানোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে জেলা পরিষদের রাজস্ব আয়েরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
নিজস্ব সম্পদ কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ
ফরিদপুর পৌর এলাকার সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জেলা পরিষদের আওতাভুক্ত নয়। তবে জেলা পরিষদের নিজস্ব জমি ও সম্পদ যেখানে রয়েছে, সেসব জায়গাকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রশাসক।
তিনি বলেন, রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ে জেলা পরিষদের জায়গায় অস্থায়ীভাবে একটি মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি সার্কিট হাউস, জেলা প্রশাসকের বাসভবন ও পুলিশ সুপারের বাসভবনের সামনের সড়কের পাশের কিছু জায়গাও জেলা পরিষদের নিজস্ব সম্পত্তি। এসব স্থানের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
সেখানে ঝর্ণা, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয়
জেলা পরিষদের কার্যক্রমের বিস্তৃতি তুলে ধরে প্রশাসক বলেন, ফরিদপুরের ৮১টি ইউনিয়নজুড়ে তাদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের মতো নির্দিষ্ট একটি এলাকার মধ্যে জেলা পরিষদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়; পুরো জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের সঙ্গে জেলা পরিষদের কাজ সম্পৃক্ত।
তার মতে, একসময় জেলা পরিষদের আওতা ছিল আরও বিস্তৃত। তখন সড়ক, এলজিইডি, গণপূর্তসহ বর্তমানে আলাদা যেসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, সেসব সুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই জেলা পরিষদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন দায়িত্ব আলাদা প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ায় জেলা পরিষদের কর্মপরিধি কমেছে।
তবে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রান্তিক জনগণের জন্য কাজ করার বড় সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, আলফাডাঙ্গার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে জেলা শহর—বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখনো জেলা পরিষদে সহায়তার প্রত্যাশা নিয়ে আসেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’
জেলা পরিষদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে নতুনভাবে শক্তিশালী ও জনবান্ধব করার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছেন। জনগণের অর্থ যাতে অপচয় বা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যয় না হয়, সে বিষয়ে তিনি কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানান।
তার বক্তব্য, জেলা পরিষদের সীমিত সম্পদও যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে সাধারণ মানুষের জন্য দৃশ্যমান উন্নয়ন করা সম্ভব। এজন্য বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি মানুষের কাছে জেলা পরিষদের কার্যক্রম দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
অনুমোদনের জটিলতায় বাধাগ্রস্ত কার্যক্রম
জেলা পরিষদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রশাসনিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন প্রশাসক। তিনি বলেন, বর্তমানে তুলনামূলক ছোট অঙ্কের কোনো কাজের টেন্ডার করতেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অথচ স্থানীয় সরকারের অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক বড় অঙ্কের কাজ নিজস্বভাবে করার সুযোগ পায়।
তার মতে, অতীতে জেলা পরিষদের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগের কারণে বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। বিশেষ করে বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার নামে অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে অতীতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় কিছু কার্যক্রম মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে জেলা পরিষদের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নিয়মিত অফিস ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি
গত ৩১ মার্চ ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নিয়মিত অফিস করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন আফজাল হোসেন খান পলাশ। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকার কথা জানান তিনি।
তার দাবি, দায়িত্বকে শুধু দাপ্তরিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ের মানুষের সমস্যা ও প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করছেন। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের অভিযোগ ও প্রত্যাশা শুনে সাধ্যমতো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আফজাল হোসেন খান পলাশ। পরবর্তীতে যুবদল ও কৃষকদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ফরিদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কিছু পরিকল্পনা সামনে আনায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও কর্মতৎপরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করছেন স্থানীয়রা।
আফজাল হোসেন খান পলাশ বলেন, ফরিদপুর জেলা পরিষদকে শুধু একটি দাপ্তরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জেলার সাধারণ মানুষের আস্থা ও সেবার একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। সীমিত সম্পদের মধ্যেই পরিকল্পিতভাবে কাজ করে জেলা পরিষদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।
তার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ১৫ তলা আধুনিক ভবন, উন্নত আবাসন সুবিধা, সাংস্কৃতিক অবকাঠামো, লেকপাড়ের বিনোদনকেন্দ্র এবং নিজস্ব সম্পদ থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ফরিদপুর জেলা পরিষদের কর্মকাণ্ডে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



















