সিজারের ৫১ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু, পেটে গজ রেখে সেলাইয়ের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৭:৩৪:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

নাজমুল হুদা বাশার, ফরিদপুর
ফরিদপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের পর এক প্রসূতির পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অপারেশনের ৫১ দিন পর ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মন্ডল নামে ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বামী।
নিহত কনিকা মন্ডল রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী। মৃত্যুকালে তিনি প্রায় দুই মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ জুন অসুস্থ হয়ে কনিকাকে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলীপাড়ার সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলার পর ওই দিন সন্ধ্যায় তার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন কনিকা।
নিহতের স্বামী অশান্ত মন্ডলের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পরদিন থেকেই কনিকার পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। পরবর্তীতে কনিকার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফরিদপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে গুরুতর অবস্থার কারণে সেখানে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের দাবি।
এরপর ৩ জুলাই কনিকাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৭ জুলাই ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা কনিকার পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ থাকার বিষয়টি শনাক্ত করেন বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, একই দিন অস্ত্রোপচার করে কনিকার পেট থেকে গজ-ব্যান্ডেজ বের করা হয়। এরপর ইবনে সিনা হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকলেও তার শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
অশান্ত মন্ডলের দাবি, ঘটনার পর ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত হোয়াটসঅ্যাপে তাকে বার্তা পাঠিয়ে ভুলের জন্য ক্ষমা চান। সেখানে চিকিৎসক লেখেন, “দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোরে ক্ষমা প্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়… আমি ভুল করে ফেলেছি… আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।”
অশান্ত মন্ডল বলেন, “আমার স্ত্রীর পেটে গজ রেখে সেলাই করার কারণেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ৫১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। এখন মাত্র দুই মাস বয়সী মেয়েটিকে কীভাবে মা-ছাড়া বড় করব? আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুরের মুজিব সড়কে সমরিতা হাসপাতালে গিয়ে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
পরে ঝিলটুলির টেরাকোটাসংলগ্ন অচিন্ত্য টাওয়ারে চিকিৎসকের বাসায় গিয়েও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বাসার দারোয়ান নাইম মোল্লা জানান, চিকিৎসক বাসায় রয়েছেন। তবে তাকে বিরক্ত না করার নির্দেশনা রয়েছে।
এ বিষয়ে সমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহশিন শরীফ বলেন, “আমার হাসপাতালে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। তবে সাংবাদিকরা ফোন করে জানিয়েছেন, আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং ওই রোগী মারা গেছেন।”
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। সাংবাদিকদের মাধ্যমেই প্রথম শুনলাম। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা ভুলের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। মাকে হারিয়ে মাত্র দুই মাস বয়সী শিশুটিকে ঘিরে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।



















