ফরিদপুরের প্রাণকেন্দ্র: হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার একটি ঐতিহ্যবাহী বাজারের বর্তমান চালচিত্র
- আপডেট সময় : ০৩:৩৫:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৫ ১৭৯০ বার পড়া হয়েছে

প্রতিবেদক: মো:টিটুল মোল্লা
ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার, যা কেবল একটি ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান নয়, বরং ফরিদপুরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ হাজী শরীয়তুল্লাহর নামানুসারে এই বাজারের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই বাজারটি বর্তমানে বেশ কিছু সমস্যায় জর্জরিত।
বাজারের গুরুত্ব ও পটভূমি:
হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার ফরিদপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বাজার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, সবজি এবং বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রের বিশাল সমাহার মেলে এখানে। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা এই বাজারে আসেন। বিশেষত, পদ্মা নদী সংলগ্ন হওয়ায় এই বাজারের মাছের আড়তটি খুবই সুপরিচিত, যেখানে ইলিশসহ নানা ধরনের মাছ বেচাকেনা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও জনদুর্ভোগ:
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা উদ্বেগজনক। প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
১. যানজট ও হকারদের দৌরাত্ম্য: বাজারের প্রধান সড়ক এবং ফুটপাতগুলো হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়ায় সারাদিনই যানজট লেগে থাকে। বাজারে প্রবেশ ও বের হওয়ার একমাত্র সড়কটিতে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এর ফলে বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
২. টোল আদায় নিয়ে বিতর্ক: সম্প্রতি হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারের লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল বা খাজনা আদায় নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীরা এই টোলমুক্ত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন, যা নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ এবং ইজারাদারের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। লাইসেন্সধারী মাছ ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত খাজনা আরোপের প্রতিবাদে একসময় ধর্মঘটও পালিত হয়েছিল।
৩. অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ: বাজারে সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের জন্য মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালিত হয়। এই উচ্ছেদ অভিযানে স্থানীয় জনগণ খুশি হলেও, পুনর্বাসন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। অবৈধ স্থাপনার কারণে বাজারের পরিবেশ নোংরা হচ্ছিল এবং বেইলি ব্রিজের দুই পাড়েও এই সমস্যা বিদ্যমান।
৪. বাজার মনিটরিং: ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ, মাছ ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের তালিকা প্রদর্শনে ব্যবসায়ীদের অনীহা দেখা যায়, যা ভোক্তা অধিকার আইনের পরিপন্থী। বিভিন্ন সময়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার পরিদর্শন করে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছে।
সম্ভাব্য সমাধান:
ঐতিহ্যবাহী এই বাজারকে তার পুরনো জৌলুস ফিরিয়ে দিতে হলে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
যানজট নিরসন: বাজারের প্রবেশপথ ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে যানজটমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
টোল নীতিমালায় স্বচ্ছতা: লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ীদের টোলমুক্ত করে একটি স্বচ্ছ টোল নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং সেটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এতে পণ্যের দাম কমে আসতে পারে এবং সাধারণ ক্রেতারা উপকৃত হতে পারেন।
নিয়মিত বাজার তদারকি: ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে নিয়মিত বাজার মনিটরিং এবং মূল্য তালিকা প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার ফরিদপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। স্থানীয় প্রশাসন ও বাজার কমিটির সম্মিলিত উদ্যোগে এই বাজারকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন এবং জনবান্ধব করে তোলা সম্ভব।বাজারের সুশাসন নিশ্চিত হলে কেবল ব্যবসায়ীরাই নন, জেলার আপামর জনসাধারণও এর সুফল ভোগ করবে।


























