যে দরজা বন্ধ হয়, তার ওপারেই হয়তো রহমতের জানালা
- আপডেট সময় : ০১:৫৬:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে

লেখক সুকান্ত চন্দ্র রায়-সমাজকর্মী, ফরিদপুর
জীবনের কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ মনে করে সব শেষ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, পরিচিত পরিচয়, সম্মান, ব্যস্ততা, ক্ষমতা সব যেন হঠাৎ থেমে যায়। তখন বুকের ভেতর এক ধরনের শূন্যতা জন্ম নেয়। মানুষ ভাবতে থাকে, “এত বছরের পথচলার পর এটাই কি প্রাপ্য ছিল?”
কিন্তু মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, সে ঘটনাকে শুধু মানুষের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখে না। সে এটাকে আল্লাহর ফয়সালা হিসেবে দেখতে শেখে। আর যে হৃদয় আল্লাহর ফয়সালাকে নিজের ইচ্ছা হিসেবে মেনে নিতে পারে, সে কখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,“আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তাঁর জন্য তিনিই যথেষ্ট।”
( সূরা তালাক: ৩)
মানুষ অনেক সময় একটি দরজা বন্ধ হতে দেখে কষ্ট পায়, অথচ বুঝতে পারে না আল্লাহ তার জন্য আরো বড় দরজা প্রস্তুত করছেন। কারণ আল্লাহ যখন কোনো কিছু সরিয়ে নেন, তখন শূন্য করার জন্য নেন না। বরং নতুন কিছু দেয়ার জন্য জায়গা তৈরি করেন।
আজ যে অবসর মনে হচ্ছে, হয়তো সেটাই নতুন জীবনের শুরু। এতদিন দায়িত্বের চাপে নিজের পরিবার, নিজের সন্তান, নিজের আত্মা, নিজের স্বপ্নগুলোর জন্য সময় ছিল না। হয়তো আল্লাহ এখন সেই সময়টাই ফিরিয়ে দিয়েছেন। মেয়েদের পাশে বসে কথা বলার সময়, তাদের জীবনের অংশ হওয়ার সময়, পরিবারের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার সময়। পৃথিবীর বড় বড় পদও অনেক সময় এই প্রশান্তি দিতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,“আল্লাহ যখন কারো কল্যাণ চান, তখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন।” তিরমিজি
পরীক্ষা মানে আল্লাহ ছেড়ে দিয়েছেন, এটা নয়। বরং অনেক সময় পরীক্ষা মানে আল্লাহ মানুষটাকে আরো উঁচু স্তরের জন্য প্রস্তুত করছেন।
একজন মানুষের আসল শক্তি তার চেয়ার নয়, তার অভিজ্ঞতা। তার পদ নয়, তার প্রজ্ঞা। তার অফিস নয়, তার যোগ্যতা। আর এই যোগ্যতা কখনো অবসরে যায় না। বরং বহু সময় সরকারি দায়িত্বের সীমাবদ্ধতা থেকে বের হয়ে একজন মানুষ তার প্রকৃত সামর্থ্যকে আরো বড় পরিসরে কাজে লাগাতে পারেন।
হয়তো আল্লাহ এখন এমন দরজা খুলে দিবেন, যেখানে আরো বেশি মর্যাদা থাকবে, আরো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকবে, আরো বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের কারণ হওয়ার সুযোগ থাকবে। কারণ রিযিকের মালিক কোনো অফিস নয়, কোনো পদ নয়, কোনো সরকার নয়। রিযিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন,“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।” সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬
আল্লাহ এখানে একবার নয়, দুইবার বলেছেন। যেন মানুষ নিশ্চিত হয়, অন্ধকার কখনো স্থায়ী নয়।
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় অনেক সময় শুরু হয় তখন, যখন মানুষ মনে করে তার গল্প শেষ হয়ে গেছে। ইউসুফ (আ.) কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, কারাগারে গিয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে সেখান থেকেই সম্মানের সর্বোচ্চ জায়গায় তুলেছিলেন।
তাই আজকের ঘটনাকে শেষ অধ্যায় ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা হয়তো শুধু অধ্যায় পরিবর্তন। আল্লাহ হয়তো পৃথিবীর ব্যস্ত মঞ্চ থেকে কিছুটা সরিয়ে এখন তাকে এমন এক জীবনের দিকে ডাকছেন, যেখানে প্রশান্তি বেশি, প্রভাব বেশি, মর্যাদা বেশি এবং আখিরাতের জন্য সঞ্চয়ও বেশি।
মুমিনের সৌন্দর্য হলো, সে আল্লাহর লেখা কষ্টের মাঝেও লুকিয়ে থাকা রহমত খুঁজে নেয়। কারণ সে জানে,“আমার রব আমার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। তিনি আমার জন্যই সিদ্ধান্ত নেন।”
আর যে দিন মানুষ এই উপলব্ধিতে পৌঁছে যায়, সেদিন তার চোখে অশ্রু থাকলেও হৃদয়ে ভাঙন থাকে না। তখন সে আবার উঠে দাঁড়ায়। নতুন উদ্দীপনায়। নতুন বিশ্বাসে। নতুন আলো নিয়ে।
























