- আপডেট সময় : ০৫:৪৭:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬ ৫৯ বার পড়া হয়েছে

স্বাধীন গণমাধ্যম শক্তিশালী না হলে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ গণমাধ্যম আজ চরম সংকট, অনিশ্চয়তা, ভয়, হুমকি, মামলা, হামলা ও পেশাগত হয়রানির মধ্য দিয়ে পথ চলেছে। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অথচ একটি স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া কখনোই গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সচেতন নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কর্মী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং পেশাদার সাংবাদিকদের মতে—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়। কারণ একজন প্রকৃত সাংবাদিক সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, ঘুষ বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেন। একজন সাংবাদিক কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না; তিনি সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করেন। তিনি জনগণের না বলা কথাগুলো রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আজ সেই সাংবাদিক সমাজই সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মারধর, মিথ্যা মামলা, প্রাণনাশের হুমকি ও সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সামান্য সম্মানি কিংবা কোনো বেতন ছাড়াই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা কিংবা আর্থিক সুরক্ষা পান না।
সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দাবি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহলের জোর দাবি—
১। অবিলম্বে “সাংবাদিক সুরক্ষা আইন” প্রণয়ন করতে হবে
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, নির্যাতন, পেশাগত বাধা ও হয়রানির বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রয়োজন। এই আইনের মাধ্যমে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
২। সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে
সাংবাদিক হত্যা, গুম, হামলা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সাংবাদিক নির্যাতন কখনো বন্ধ হবে না।
৩। সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
দেশের বহু সাংবাদিক বছরের পর বছর কাজ করেও নিয়মিত বেতন পান না। নেই চিকিৎসা সুবিধা, জীবনবীমা, পেনশন কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। তাই সরকারের উদ্যোগে—
সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল বৃদ্ধি,
# স্বাস্থ্য কার্ড চালু,
# জীবনবীমা সুবিধা,
# স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান,
# আবাসন সুবিধা,
# অসুস্থ সাংবাদিকদের চিকিৎসা সহায়তা,
# মৃত সাংবাদিক পরিবারের পুনর্বাসন ও শিক্ষা সহায়তা
নিশ্চিত করা জরুরি।
৪। প্রকৃত সাংবাদিকদের জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে
অপসাংবাদিকতা রোধে প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। সরকারি নিবন্ধনের আওতায় পরিচয়পত্র প্রদান করা হলে পেশাদার সাংবাদিকরা নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা সহজে পাবেন এবং ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য কমবে।
৫। তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে
সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে সাংবাদিকদের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন সাংবাদিকদের তথ্য দিতে অযথা হয়রানি, ঘুষ দাবি বা অসহযোগিতা করতে না পারেন, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন। তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হলে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে।
৬। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের শ্রম অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। নিয়মিত বেতন, নিয়োগপত্র, উৎসব ভাতা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষকে বাধ্য করতে হবে।
৭। সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে
৮। ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা দ্বারা কোন সাংবাদিক কে লাঞ্ছিত করা হলে তাঁকে দল থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বহিস্কার করা ও আইন আনুগ ব্যবস্থা নেয়া।
৯।বিরোধীদলীয় বা যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা দ্বারা কোন সাংবাদিক কে লাঞ্ছিত করা হলে দল থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বহিস্কার করা ও আইন আনুগ ব্যবস্থা নেয়া।
কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে সংবাদ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
স্বাধীন গণমাধ্যমই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারকেও শক্তিশালী করে। কারণ গণমাধ্যম ভুল-ত্রুটি ও অনিয়ম তুলে ধরে রাষ্ট্রকে সংশোধনের সুযোগ দেয়। সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ করা মানে দুর্নীতি ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য গোপন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে। সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন, পেশাগত মর্যাদা, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা গেলে দেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
একজন সাংবাদিক যখন সত্য প্রকাশ করেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ লেখেন না; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজকে জাগিয়ে তোলেন। তাই সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ নয়, বরং তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই একটি সভ্য, উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে।
সচেতন মহল মনে করে—সাংবাদিকদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই জনগণের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি জাতির বিবেক, জনগণের অধিকার এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

















