ঢাকা ০১:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
রামিসা হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভ ও উদ্বেগ: শিশু নিরাপত্তায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি ফরিদপুর মহানগর প্রেস ক্লাব এর সভাপতির কৃতজ্ঞতা বনাম অকৃতজ্ঞতা (কেন কৃতজ্ঞ মানুষ জীবনে আরো বেশি পায়, আর অকৃতজ্ঞ মানুষ ধীরে ধীরে সুযোগ হারায়) ফরিদপুরে দোকানের ক্যাশ বক্স থেকে ৬৫ হাজার টাকা চুরির অভিযোগ ফরিদপুরে রামিসা ধর্ষণের প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত রামিসা হত্যাকাণ্ডে মানবিক সমাজ গড়ার আহ্বান জেলা পরিষদের প্রশাসক পলাশ খান এর ফরিদপুরে অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার পাংশায় ব্র্যাক সিডের কর্মশালা অনুষ্ঠিত আধুনিক কলাকৌশলে হাইব্রিড ধানের অধিক ফলন নিশ্চিতকরণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ ২০২৬ ফরিদপুরে ছালাম বেপারী হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবারের ক্ষোভ নগরকান্দায় রাতভর অবৈধ মাটি কাটার অভিযোগ, অতিষ্ঠ স্থানীয়রা

কৃতজ্ঞতা বনাম অকৃতজ্ঞতা (কেন কৃতজ্ঞ মানুষ জীবনে আরো বেশি পায়, আর অকৃতজ্ঞ মানুষ ধীরে ধীরে সুযোগ হারায়)

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৯:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ১৫৩ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

লেখক ( সুকান্ত চন্দ্র রায় , সমাজকর্মী ফরিদপুর ) 

মানুষের জীবনে কিছু অদৃশ্য দরজা আছে। সেগুলো কোনো চাবি দিয়ে খোলে না। খোলে চরিত্র দিয়ে। খোলে হৃদয়ের অবস্থান দিয়ে। আর সেই দরজাগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী চাবিগুলোর একটি হলো কৃতজ্ঞতা।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কৃতজ্ঞ মানুষরা সবসময় সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হয় না, কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশি বরকতের মতো এক গভীর সমৃদ্ধির মালিক হয়। তাদের চারপাশে মানুষ থাকে, আস্থা থাকে, সম্পর্ক টিকে থাকে, সুযোগ ফিরে ফিরে আসে। অন্যদিকে অকৃতজ্ঞ মানুষ কখনো কখনো অনেক কিছু পেয়েও একসময় একা হয়ে যায়। মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। সাহায্যের হাত গুটিয়ে নেয়। জীবন থেকেও যেন ধীরে ধীরে আলো কমে যেতে থাকে।

কারণ পৃথিবী শুধু যোগ্যতার উপর চলে না, পৃথিবী হৃদয়ের ভাষাও বোঝে।

কৃতজ্ঞতা আসলে শুধু “ধন্যবাদ” বলা নয়।

এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

একটি মানসিক অবস্থা।

একটি গভীর উপলব্ধি যে, “আমি যা পেয়েছি, তার সবই শুধু আমার একার কৃতিত্ব নয়; এর মধ্যে অন্যের অবদান আছে, ভালোবাসা আছে, সহানুভূতি আছে, জীবনের অদৃশ্য অনুগ্রহ আছে।”

যে মানুষ এই উপলব্ধি অর্জন করে, তার ভিতরে এক ধরনের কোমলতা জন্মায়। সে অহংকারী হয় না। সে ছোট ছোট জিনিসেও আনন্দ খুঁজে পায়। সে মানুষের অবদানকে সম্মান করে। আর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এমন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

কারণ মানুষ এমন কারো পাশে থাকতে চায়, যে তার মূল্য বোঝে।

একজন কৃতজ্ঞ কর্মীর কথা ভাবুন। অফিসে হয়তো সে সবচেয়ে মেধাবী নয়, কিন্তু সে সহকর্মীর সহযোগিতা মনে রাখে, সুযোগের মূল্য দেয়, শেখার সুযোগ পেলে কৃতজ্ঞ হয়। অদ্ভুতভাবে দেখা যায়, কঠিন সময়ে মানুষ তাকেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। নেতৃত্বও শেষ পর্যন্ত তার উপর আস্থা রাখে।

অন্যদিকে এমন একজন মানুষও আছে, যে সবকিছুকে নিজের প্রাপ্য মনে করে। তাকে সাহায্য করা হলে সে ভাবে, “এটাই তো করা উচিত ছিল।” তাকে সম্মান দিলে সে আরো বেশি দাবি করে। সে কখনো তৃপ্ত হয় না, কখনো স্বীকার করে না যে অন্যের অবদানও তার জীবনে ভূমিকা রেখেছে। ধীরে ধীরে মানুষ তার কাছ থেকে আবেগ সরিয়ে নিতে শুরু করে।

কেউ তাকে সরাসরি বলে না, “তুমি অকৃতজ্ঞ।”

কিন্তু মানুষ নীরবে দূরে সরে যায়।

কারণ অকৃতজ্ঞতা মানুষের হৃদয়কে ক্লান্ত করে।

বিশ্বের প্রায় সব আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দর্শনেই কৃতজ্ঞতাকে মানুষের অন্যতম বড় গুণ হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে, সংযুক্ত করে, মানবিক করে। আর অকৃতজ্ঞতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, অস্থির করে, ভিতরে ভিতরে শূন্য করে দেয়।

কৃতজ্ঞতা শুধু নৈতিক সৌন্দর্য নয়, এটি জীবনের এক গভীর বাস্তব সূত্রও।

যে মানুষ কৃতজ্ঞ হতে জানে, তার জীবনে সাধারণত আরো সম্পর্ক টিকে থাকে। মানুষ তার পাশে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ সে মানুষকে ব্যবহার করে না, মূল্য দেয়। সে প্রাপ্তিকে অধিকার নয়, উপহার হিসেবে দেখে।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও কৃতজ্ঞতা অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মানসিক অবস্থা। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞ মানুষ বেশি ইতিবাচক, বেশি resilient, এবং সম্পর্ক রক্ষা করতে বেশি সক্ষম। কারণ কৃতজ্ঞতা মানুষের মনকে “অভাব” থেকে “প্রাচুর্য”-এর দিকে নিয়ে যায়।

অকৃতজ্ঞ মানুষ সবসময় কী নেই, সেটি দেখে।

কৃতজ্ঞ মানুষ কী আছে, সেটি দেখে।

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই দুই জীবনের পার্থক্য তৈরি করে।

যে ব্যক্তি প্রতিদিন শুধু অভিযোগ করে, সে ধীরে ধীরে নিজের মনকেই বিষাক্ত করে ফেলে। অভিযোগের অভ্যাস মানুষকে এমন এক মানসিক অন্ধকারে নিয়ে যায়, যেখানে কোনো আশীর্বাদই যথেষ্ট মনে হয় না।

অথচ একই ঘরে, একই আয়ে, একই জীবনে থেকেও একজন মানুষ শান্তিতে ঘুমায়, আরেকজন অস্থিরতায় জ্বলে।

কারণ শান্তি জিনিসের পরিমাণে আসে না, উপলব্ধির গুণমানে আসে।

অকৃতজ্ঞতার সঙ্গে অহংকারের একটি গভীর সম্পর্ক আছে।

যে মানুষ মনে করে, “সবকিছু আমি ডিজার্ভ করি”, সে আসলে ধীরে ধীরে বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে। সে ভুলে যায়, জীবনে তার অবস্থানের পেছনে কত মানুষের ত্যাগ, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও নীরব ভালোবাসা আছে।

একজন সন্তান যদি বাবা-মায়ের ত্যাগকে স্বাভাবিক ধরে নেয়, একদিন সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে যায়।

একজন স্বামী বা স্ত্রী যদি সঙ্গীর নিরব অবদানকে মূল্য না দেয়, একদিন ঘর শুধু দেয়াল হয়ে যায়।

একজন নেতা যদি কর্মীদের শ্রমকে সম্মান না করে, একদিন তার চারপাশ ফাঁকা হয়ে যায়।

কারণ মানুষ শুধু অর্থের জন্য কাজ করে না, মানুষ মূল্যায়নের জন্যও বাঁচে।

একটি শুকনো গাছকে যদি প্রতিদিন পানি দেওয়া হয়, অথচ সে কখনো সবুজ না হয়, একসময় মালীও ক্লান্ত হয়ে যায়।

অকৃতজ্ঞ মানুষ অনেকটা সেই গাছের মতো।

তাকে যতই দেওয়া হোক, সে ততই আরো অভিযোগ খুঁজে পায়।

আর কৃতজ্ঞ মানুষ?

সে মরুভূমিতেও বৃষ্টির গন্ধ খুঁজে পায়।

এ কারণেই কৃতজ্ঞ মানুষের ভেতরে এক ধরনের আলো থাকে। তারা ছোট অনুগ্রহকেও বড় করে দেখে। তারা মানুষের ভালোবাসাকে অবহেলা করে না। ফলে মানুষও তাদের জন্য আরো কিছু করতে চায়।

কখনো খেয়াল করেছেন?

কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য দরজা নিজে থেকেই খুলে যায়। মানুষ তাদের নাম শুনে সাহায্য করতে চায়। সুযোগ যেন তাদের দিকে এগিয়ে আসে। এর পেছনে শুধু দক্ষতা কাজ করে না; কাজ করে তাদের চরিত্র, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা।

কারণ কৃতজ্ঞতা হৃদয়ে বিশ্বাস তৈরি করে।

আর বিশ্বাস এমন এক মুদ্রা, যা হারিয়ে গেলে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষও দরিদ্র হয়ে যায়।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অকৃতজ্ঞ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে ধীরে ধীরে সব হারাচ্ছে। সে ভাবে, “মানুষ বদলে গেছে।” অথচ বাস্তবে মানুষ ক্লান্ত হয়ে গেছে তার অবমূল্যায়ন, অভিযোগ আর entitlement mentality দেখে।

যে মানুষ কখনো থেমে নিজের জীবনের প্রাপ্তিগুলো অনুভব করতে শেখেনি, সে কখনো পূর্ণতা অনুভব করতে পারে না। কারণ তার চোখ সবসময় পরবর্তী জিনিসের দিকে থাকে। সে যা পেয়েছে, তা উপভোগ করার আগেই যা পায়নি, তার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।

ফলে তার জীবন হয়ে যায় এক অন্তহীন শূন্যতার দৌড়।

কৃতজ্ঞতা প্রাচুর্যেরও একটি রহস্য।

অনেক মানুষের আয় কম, কিন্তু জীবনে প্রশান্তি বেশি।

আবার অনেকের আয় বেশি, কিন্তু সম্পর্ক ভাঙা, মন অশান্ত, ঘুম নেই।

সমৃদ্ধি শুধু সংখ্যায় আসে না।

সমৃদ্ধি আসে সন্তুষ্টিতে।

সমৃদ্ধি আসে হৃদয়ের আলোতে।

সমৃদ্ধি আসে সেই ঘরে, যেখানে মানুষ একে অপরের অবদানকে সম্মান করে।

একজন কৃতজ্ঞ নেতা তার টিমকে বড় করে তোলে।

একজন কৃতজ্ঞ সঙ্গী পরিবারকে নিরাপদ অনুভব করায়।

একজন কৃতজ্ঞ সন্তান বাবা-মায়ের হৃদয়ে শান্তি আনে।

একজন কৃতজ্ঞ বন্ধু সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।

অথচ অকৃতজ্ঞ মানুষ একসময় বুঝতে পারে, তার চারপাশে অনেক মানুষ আছে, কিন্তু কেউ হৃদয় দিয়ে তার পাশে নেই।

কারণ অকৃতজ্ঞতা মানুষকে ধীরে ধীরে আবেগগতভাবে নিঃস্ব করে দেয়।

জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো, মানুষ অনেক আশীর্বাদ হারানোর পর বুঝতে পারে, সে কত সমৃদ্ধ ছিল।

যে মানুষটি প্রতিদিন পাশে ছিল,

যে বন্ধু সবসময় ফোন ধরত,

যে বাবা-মা নীরবে কষ্ট করেছে,

যে সহকর্মী চুপচাপ সাহায্য করেছে,

যে জীবন বারবার নতুন সুযোগ দিয়েছে…

সবকিছু একদিন অভ্যাস হয়ে যায়।

আর অভ্যাস হয়ে যাওয়া আশীর্বাদকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়ন করে।

হয়তো এ কারণেই কৃতজ্ঞতা শুধু একটি নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি আত্মাকে জীবিত রাখার শিল্প।

মনে রাখা জরুরী :

“যে মানুষ ছোট অনুগ্রহের মূল্য বোঝে না, সে বড় আশীর্বাদের যোগ্যতাও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে।”

“অকৃতজ্ঞতা প্রথমে সম্পর্ক নষ্ট করে, তারপর হৃদয় নষ্ট করে, শেষে ভাগ্যও নষ্ট করে।”

“কৃতজ্ঞ মানুষ সবকিছু পায় না, কিন্তু যা পায় তাতে এমন মোটিভেশন খুঁজে পায়। আর সেই মোটিভেশনই তাকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যায়।”

“মানুষ আপনার প্রতিভা মনে না-ও রাখতে পারে, কিন্তু আপনি তাকে মূল্য দিয়েছিলেন কি না, তা সে কখনো ভুলে যায় না।”

আজকের পৃথিবীতে আমরা সাফল্যের অনেক সূত্র শিখি, কিন্তু কৃতজ্ঞতার সূত্র ভুলে যাই। অথচ জীবনের অনেক দরজা মেধা দিয়ে নয়, চরিত্র দিয়ে খোলে।

তাই মাঝে মাঝে থেমে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার:

আমি কি শুধু আরো চাইছি, নাকি যা পেয়েছি তার মর্যাদাও দিচ্ছি?

আমি কি মানুষের অবদানকে স্বীকার করি?

আমি কি অভিযোগে ভরা, নাকি উপলব্ধিতে ভরা?

কারণ শেষ পর্যন্ত জীবন শুধু আমরা কত পেলাম, তার হিসাব রাখে না।

জীবন এটাও দেখে, আমরা যা পেয়েছিলাম, তার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ ছিলাম।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

কৃতজ্ঞতা বনাম অকৃতজ্ঞতা (কেন কৃতজ্ঞ মানুষ জীবনে আরো বেশি পায়, আর অকৃতজ্ঞ মানুষ ধীরে ধীরে সুযোগ হারায়)

আপডেট সময় : ০২:৪৯:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

 

 

লেখক ( সুকান্ত চন্দ্র রায় , সমাজকর্মী ফরিদপুর ) 

মানুষের জীবনে কিছু অদৃশ্য দরজা আছে। সেগুলো কোনো চাবি দিয়ে খোলে না। খোলে চরিত্র দিয়ে। খোলে হৃদয়ের অবস্থান দিয়ে। আর সেই দরজাগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী চাবিগুলোর একটি হলো কৃতজ্ঞতা।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কৃতজ্ঞ মানুষরা সবসময় সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হয় না, কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশি বরকতের মতো এক গভীর সমৃদ্ধির মালিক হয়। তাদের চারপাশে মানুষ থাকে, আস্থা থাকে, সম্পর্ক টিকে থাকে, সুযোগ ফিরে ফিরে আসে। অন্যদিকে অকৃতজ্ঞ মানুষ কখনো কখনো অনেক কিছু পেয়েও একসময় একা হয়ে যায়। মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। সাহায্যের হাত গুটিয়ে নেয়। জীবন থেকেও যেন ধীরে ধীরে আলো কমে যেতে থাকে।

কারণ পৃথিবী শুধু যোগ্যতার উপর চলে না, পৃথিবী হৃদয়ের ভাষাও বোঝে।

কৃতজ্ঞতা আসলে শুধু “ধন্যবাদ” বলা নয়।

এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

একটি মানসিক অবস্থা।

একটি গভীর উপলব্ধি যে, “আমি যা পেয়েছি, তার সবই শুধু আমার একার কৃতিত্ব নয়; এর মধ্যে অন্যের অবদান আছে, ভালোবাসা আছে, সহানুভূতি আছে, জীবনের অদৃশ্য অনুগ্রহ আছে।”

যে মানুষ এই উপলব্ধি অর্জন করে, তার ভিতরে এক ধরনের কোমলতা জন্মায়। সে অহংকারী হয় না। সে ছোট ছোট জিনিসেও আনন্দ খুঁজে পায়। সে মানুষের অবদানকে সম্মান করে। আর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এমন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

কারণ মানুষ এমন কারো পাশে থাকতে চায়, যে তার মূল্য বোঝে।

একজন কৃতজ্ঞ কর্মীর কথা ভাবুন। অফিসে হয়তো সে সবচেয়ে মেধাবী নয়, কিন্তু সে সহকর্মীর সহযোগিতা মনে রাখে, সুযোগের মূল্য দেয়, শেখার সুযোগ পেলে কৃতজ্ঞ হয়। অদ্ভুতভাবে দেখা যায়, কঠিন সময়ে মানুষ তাকেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। নেতৃত্বও শেষ পর্যন্ত তার উপর আস্থা রাখে।

অন্যদিকে এমন একজন মানুষও আছে, যে সবকিছুকে নিজের প্রাপ্য মনে করে। তাকে সাহায্য করা হলে সে ভাবে, “এটাই তো করা উচিত ছিল।” তাকে সম্মান দিলে সে আরো বেশি দাবি করে। সে কখনো তৃপ্ত হয় না, কখনো স্বীকার করে না যে অন্যের অবদানও তার জীবনে ভূমিকা রেখেছে। ধীরে ধীরে মানুষ তার কাছ থেকে আবেগ সরিয়ে নিতে শুরু করে।

কেউ তাকে সরাসরি বলে না, “তুমি অকৃতজ্ঞ।”

কিন্তু মানুষ নীরবে দূরে সরে যায়।

কারণ অকৃতজ্ঞতা মানুষের হৃদয়কে ক্লান্ত করে।

বিশ্বের প্রায় সব আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দর্শনেই কৃতজ্ঞতাকে মানুষের অন্যতম বড় গুণ হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে, সংযুক্ত করে, মানবিক করে। আর অকৃতজ্ঞতা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, অস্থির করে, ভিতরে ভিতরে শূন্য করে দেয়।

কৃতজ্ঞতা শুধু নৈতিক সৌন্দর্য নয়, এটি জীবনের এক গভীর বাস্তব সূত্রও।

যে মানুষ কৃতজ্ঞ হতে জানে, তার জীবনে সাধারণত আরো সম্পর্ক টিকে থাকে। মানুষ তার পাশে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ সে মানুষকে ব্যবহার করে না, মূল্য দেয়। সে প্রাপ্তিকে অধিকার নয়, উপহার হিসেবে দেখে।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও কৃতজ্ঞতা অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মানসিক অবস্থা। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞ মানুষ বেশি ইতিবাচক, বেশি resilient, এবং সম্পর্ক রক্ষা করতে বেশি সক্ষম। কারণ কৃতজ্ঞতা মানুষের মনকে “অভাব” থেকে “প্রাচুর্য”-এর দিকে নিয়ে যায়।

অকৃতজ্ঞ মানুষ সবসময় কী নেই, সেটি দেখে।

কৃতজ্ঞ মানুষ কী আছে, সেটি দেখে।

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই দুই জীবনের পার্থক্য তৈরি করে।

যে ব্যক্তি প্রতিদিন শুধু অভিযোগ করে, সে ধীরে ধীরে নিজের মনকেই বিষাক্ত করে ফেলে। অভিযোগের অভ্যাস মানুষকে এমন এক মানসিক অন্ধকারে নিয়ে যায়, যেখানে কোনো আশীর্বাদই যথেষ্ট মনে হয় না।

অথচ একই ঘরে, একই আয়ে, একই জীবনে থেকেও একজন মানুষ শান্তিতে ঘুমায়, আরেকজন অস্থিরতায় জ্বলে।

কারণ শান্তি জিনিসের পরিমাণে আসে না, উপলব্ধির গুণমানে আসে।

অকৃতজ্ঞতার সঙ্গে অহংকারের একটি গভীর সম্পর্ক আছে।

যে মানুষ মনে করে, “সবকিছু আমি ডিজার্ভ করি”, সে আসলে ধীরে ধীরে বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে। সে ভুলে যায়, জীবনে তার অবস্থানের পেছনে কত মানুষের ত্যাগ, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও নীরব ভালোবাসা আছে।

একজন সন্তান যদি বাবা-মায়ের ত্যাগকে স্বাভাবিক ধরে নেয়, একদিন সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে যায়।

একজন স্বামী বা স্ত্রী যদি সঙ্গীর নিরব অবদানকে মূল্য না দেয়, একদিন ঘর শুধু দেয়াল হয়ে যায়।

একজন নেতা যদি কর্মীদের শ্রমকে সম্মান না করে, একদিন তার চারপাশ ফাঁকা হয়ে যায়।

কারণ মানুষ শুধু অর্থের জন্য কাজ করে না, মানুষ মূল্যায়নের জন্যও বাঁচে।

একটি শুকনো গাছকে যদি প্রতিদিন পানি দেওয়া হয়, অথচ সে কখনো সবুজ না হয়, একসময় মালীও ক্লান্ত হয়ে যায়।

অকৃতজ্ঞ মানুষ অনেকটা সেই গাছের মতো।

তাকে যতই দেওয়া হোক, সে ততই আরো অভিযোগ খুঁজে পায়।

আর কৃতজ্ঞ মানুষ?

সে মরুভূমিতেও বৃষ্টির গন্ধ খুঁজে পায়।

এ কারণেই কৃতজ্ঞ মানুষের ভেতরে এক ধরনের আলো থাকে। তারা ছোট অনুগ্রহকেও বড় করে দেখে। তারা মানুষের ভালোবাসাকে অবহেলা করে না। ফলে মানুষও তাদের জন্য আরো কিছু করতে চায়।

কখনো খেয়াল করেছেন?

কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য দরজা নিজে থেকেই খুলে যায়। মানুষ তাদের নাম শুনে সাহায্য করতে চায়। সুযোগ যেন তাদের দিকে এগিয়ে আসে। এর পেছনে শুধু দক্ষতা কাজ করে না; কাজ করে তাদের চরিত্র, বিনয় ও কৃতজ্ঞতা।

কারণ কৃতজ্ঞতা হৃদয়ে বিশ্বাস তৈরি করে।

আর বিশ্বাস এমন এক মুদ্রা, যা হারিয়ে গেলে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষও দরিদ্র হয়ে যায়।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অকৃতজ্ঞ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে ধীরে ধীরে সব হারাচ্ছে। সে ভাবে, “মানুষ বদলে গেছে।” অথচ বাস্তবে মানুষ ক্লান্ত হয়ে গেছে তার অবমূল্যায়ন, অভিযোগ আর entitlement mentality দেখে।

যে মানুষ কখনো থেমে নিজের জীবনের প্রাপ্তিগুলো অনুভব করতে শেখেনি, সে কখনো পূর্ণতা অনুভব করতে পারে না। কারণ তার চোখ সবসময় পরবর্তী জিনিসের দিকে থাকে। সে যা পেয়েছে, তা উপভোগ করার আগেই যা পায়নি, তার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।

ফলে তার জীবন হয়ে যায় এক অন্তহীন শূন্যতার দৌড়।

কৃতজ্ঞতা প্রাচুর্যেরও একটি রহস্য।

অনেক মানুষের আয় কম, কিন্তু জীবনে প্রশান্তি বেশি।

আবার অনেকের আয় বেশি, কিন্তু সম্পর্ক ভাঙা, মন অশান্ত, ঘুম নেই।

সমৃদ্ধি শুধু সংখ্যায় আসে না।

সমৃদ্ধি আসে সন্তুষ্টিতে।

সমৃদ্ধি আসে হৃদয়ের আলোতে।

সমৃদ্ধি আসে সেই ঘরে, যেখানে মানুষ একে অপরের অবদানকে সম্মান করে।

একজন কৃতজ্ঞ নেতা তার টিমকে বড় করে তোলে।

একজন কৃতজ্ঞ সঙ্গী পরিবারকে নিরাপদ অনুভব করায়।

একজন কৃতজ্ঞ সন্তান বাবা-মায়ের হৃদয়ে শান্তি আনে।

একজন কৃতজ্ঞ বন্ধু সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।

অথচ অকৃতজ্ঞ মানুষ একসময় বুঝতে পারে, তার চারপাশে অনেক মানুষ আছে, কিন্তু কেউ হৃদয় দিয়ে তার পাশে নেই।

কারণ অকৃতজ্ঞতা মানুষকে ধীরে ধীরে আবেগগতভাবে নিঃস্ব করে দেয়।

জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো, মানুষ অনেক আশীর্বাদ হারানোর পর বুঝতে পারে, সে কত সমৃদ্ধ ছিল।

যে মানুষটি প্রতিদিন পাশে ছিল,

যে বন্ধু সবসময় ফোন ধরত,

যে বাবা-মা নীরবে কষ্ট করেছে,

যে সহকর্মী চুপচাপ সাহায্য করেছে,

যে জীবন বারবার নতুন সুযোগ দিয়েছে…

সবকিছু একদিন অভ্যাস হয়ে যায়।

আর অভ্যাস হয়ে যাওয়া আশীর্বাদকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়ন করে।

হয়তো এ কারণেই কৃতজ্ঞতা শুধু একটি নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি আত্মাকে জীবিত রাখার শিল্প।

মনে রাখা জরুরী :

“যে মানুষ ছোট অনুগ্রহের মূল্য বোঝে না, সে বড় আশীর্বাদের যোগ্যতাও ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে।”

“অকৃতজ্ঞতা প্রথমে সম্পর্ক নষ্ট করে, তারপর হৃদয় নষ্ট করে, শেষে ভাগ্যও নষ্ট করে।”

“কৃতজ্ঞ মানুষ সবকিছু পায় না, কিন্তু যা পায় তাতে এমন মোটিভেশন খুঁজে পায়। আর সেই মোটিভেশনই তাকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যায়।”

“মানুষ আপনার প্রতিভা মনে না-ও রাখতে পারে, কিন্তু আপনি তাকে মূল্য দিয়েছিলেন কি না, তা সে কখনো ভুলে যায় না।”

আজকের পৃথিবীতে আমরা সাফল্যের অনেক সূত্র শিখি, কিন্তু কৃতজ্ঞতার সূত্র ভুলে যাই। অথচ জীবনের অনেক দরজা মেধা দিয়ে নয়, চরিত্র দিয়ে খোলে।

তাই মাঝে মাঝে থেমে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার:

আমি কি শুধু আরো চাইছি, নাকি যা পেয়েছি তার মর্যাদাও দিচ্ছি?

আমি কি মানুষের অবদানকে স্বীকার করি?

আমি কি অভিযোগে ভরা, নাকি উপলব্ধিতে ভরা?

কারণ শেষ পর্যন্ত জীবন শুধু আমরা কত পেলাম, তার হিসাব রাখে না।

জীবন এটাও দেখে, আমরা যা পেয়েছিলাম, তার প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ ছিলাম।