ঢাকা ০৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ইউসুফ শেখকে বিষ প্রয়োগে হত্যার অভিযোগ ফরিদপুরে ৫৩ লিটার চোলাই মদসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার ফরিদপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত তিন মাদারীপুরে ৩ কেজি গাঁজাসহ দুই নারী মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার।   টেপাখোলা গরুর হাট সংলগ্ন ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম চলমান, জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভার উদ্যোগ টেপাখোলা ইয়াছিন মঞ্জিল জামে মসজিদ সংলগ্ন সড়কের জলাবদ্ধতা নিরসনে পাইপ ড্রেন নির্মাণকাজ পরিদর্শন সাংবাদিক ইব্রাহিম হোসেনের বাবার মৃত্যুতে ফরিদপুর মহানগর প্রেস ক্লাবের শোক বিদায়ী ও নবাগত ১৪ বিজিবি অধিনায়কের সঙ্গে নওগাঁ পুলিশ সুপারের সৌজন্য সাক্ষাৎ মাদারীপুরে মানবপাচার মামলার আসামি শহিদুল মোল্লা গ্রেফতার রায়পুরায় প্রকাশ্যে একজন কে গুলি করে হত্যা, আহত ৩

নজরুল সংগীতে মুগ্ধতা ছড়ালেন ফরিদপুরের ‘লাইলি খালা’

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৩২:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬ ১৬২ বার পড়া হয়েছে

Oplus_16908288

আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

রেজাউল করিম, ফরিদপুর

 

ফরিদপুর শহরের অলিগলি, রেলস্টেশন, হাট-বাজার কিংবা নদীর ঘাট—সবখানেই খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো এক নারীকে বহুদিন ধরেই চেনেন স্থানীয় মানুষ। জীর্ণ পোশাক, কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ আর এলোমেলো চুলের কারণে অনেকে তাকে ভবঘুরে বলেই চিনতেন। তবে সেই পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ সংগীত প্রতিভা।

ফরিদপুর শহরে সবার কাছে তিনি পরিচিত “লাইলি খালা” নামে। সম্প্রতি নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ করেই মঞ্চে উঠে তিনি গেয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান “নয়নভরা জল গো তোমার…”। তার আবেগঘন কণ্ঠ মুহূর্তেই মুগ্ধ করে উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের।

অনুষ্ঠানে থাকা অনেকেই মোবাইলে তার গান ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপর খুব দ্রুতই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ তার গানের প্রশংসা করে মন্তব্য করেন। কেউ লিখেছেন, “এমন প্রতিভা অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে।” আবার কেউ বলেছেন, “শিল্পের কোনো বাহ্যিক পরিচয় নেই, সত্যিকারের প্রতিভা মানুষকে স্পর্শ করবেই।”

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন জানান, লাইলি খালাকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমিতে দায়িত্ব পালনকালে প্রায়ই তাকে সেখানে আসতে দেখতেন। একসময় তার গান শুনে বিস্মিত হন তিনি। পরে সংগীত শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লাইলি খালা হারমোনিয়াম বাজানোও শিখে নেন।

তিনি আরও জানান, লাইলি খালা নিয়মিত শিল্পকলায় এসে গান শুনতেন এবং মাঝে মাঝে নিজেও গান পরিবেশন করতেন। নূরজাহান, লতা মঙ্গেশকর ও মেহেদী হাসানের গানও তিনি দারুণ আবেগ দিয়ে গাইতে পারেন।

জানা যায়, লাইলি খালার বাড়ি ফরিদপুর সদর উপজেলার হারুকান্দি গ্রামে। এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী হলেও বহু বছর আগে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এরপর থেকেই শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোই যেন হয়ে ওঠে তার জীবন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি প্রায়ই একা একা শহরের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। কখনও হঠাৎ কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যান, পরে আবার ফিরে আসেন। তার জীবন নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা রহস্য ও কৌতূহল।

একবার মফিজ ইমাম মিলনের প্রশ্নের জবাবে লাইলি খালা বলেছিলেন, “আমি মানুষ দেখি। দুনিয়ায় কত রকমের মানুষ আছে, তা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।”

সম্প্রতি ফরিদপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের “ফরিদপুর হেরিটেজ” অনুষ্ঠানেও গান গেয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তিনি।

নজরুল জয়ন্তীর এবারের অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ফরিদপুরের ঐতিহাসিক “ময়েজ মঞ্জিল”-এ। যে ভবনে একসময় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এসেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক পরিবেশেই নজরুলের গান গেয়ে সবার হৃদয় ছুঁয়ে যান লাইলি খালা।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা মনে করছেন, সমাজের আড়ালে এখনও অনেক প্রতিভাবান মানুষ রয়েছেন, যাদের সামনে আনার সুযোগ খুব কম। লাইলি খালার ভাইরাল হওয়া ঘটনা সেই অবহেলিত প্রতিভাগুলোকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

জীবনের নানা অভাব-অভিযোগ আর অবহেলার মাঝেও লাইলি খালা যেন আবারও প্রমাণ করলেন—সত্যিকারের শিল্প ও প্রতিভা কখনও হারিয়ে যায় না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

নজরুল সংগীতে মুগ্ধতা ছড়ালেন ফরিদপুরের ‘লাইলি খালা’

আপডেট সময় : ১১:৩২:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

 

রেজাউল করিম, ফরিদপুর

 

ফরিদপুর শহরের অলিগলি, রেলস্টেশন, হাট-বাজার কিংবা নদীর ঘাট—সবখানেই খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো এক নারীকে বহুদিন ধরেই চেনেন স্থানীয় মানুষ। জীর্ণ পোশাক, কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ আর এলোমেলো চুলের কারণে অনেকে তাকে ভবঘুরে বলেই চিনতেন। তবে সেই পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ সংগীত প্রতিভা।

ফরিদপুর শহরে সবার কাছে তিনি পরিচিত “লাইলি খালা” নামে। সম্প্রতি নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ করেই মঞ্চে উঠে তিনি গেয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান “নয়নভরা জল গো তোমার…”। তার আবেগঘন কণ্ঠ মুহূর্তেই মুগ্ধ করে উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের।

অনুষ্ঠানে থাকা অনেকেই মোবাইলে তার গান ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপর খুব দ্রুতই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ তার গানের প্রশংসা করে মন্তব্য করেন। কেউ লিখেছেন, “এমন প্রতিভা অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে।” আবার কেউ বলেছেন, “শিল্পের কোনো বাহ্যিক পরিচয় নেই, সত্যিকারের প্রতিভা মানুষকে স্পর্শ করবেই।”

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন জানান, লাইলি খালাকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমিতে দায়িত্ব পালনকালে প্রায়ই তাকে সেখানে আসতে দেখতেন। একসময় তার গান শুনে বিস্মিত হন তিনি। পরে সংগীত শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লাইলি খালা হারমোনিয়াম বাজানোও শিখে নেন।

তিনি আরও জানান, লাইলি খালা নিয়মিত শিল্পকলায় এসে গান শুনতেন এবং মাঝে মাঝে নিজেও গান পরিবেশন করতেন। নূরজাহান, লতা মঙ্গেশকর ও মেহেদী হাসানের গানও তিনি দারুণ আবেগ দিয়ে গাইতে পারেন।

জানা যায়, লাইলি খালার বাড়ি ফরিদপুর সদর উপজেলার হারুকান্দি গ্রামে। এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী হলেও বহু বছর আগে সংসার ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এরপর থেকেই শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোই যেন হয়ে ওঠে তার জীবন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি প্রায়ই একা একা শহরের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। কখনও হঠাৎ কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যান, পরে আবার ফিরে আসেন। তার জীবন নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা রহস্য ও কৌতূহল।

একবার মফিজ ইমাম মিলনের প্রশ্নের জবাবে লাইলি খালা বলেছিলেন, “আমি মানুষ দেখি। দুনিয়ায় কত রকমের মানুষ আছে, তা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।”

সম্প্রতি ফরিদপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে তাকে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের “ফরিদপুর হেরিটেজ” অনুষ্ঠানেও গান গেয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তিনি।

নজরুল জয়ন্তীর এবারের অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় ফরিদপুরের ঐতিহাসিক “ময়েজ মঞ্জিল”-এ। যে ভবনে একসময় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও এসেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক পরিবেশেই নজরুলের গান গেয়ে সবার হৃদয় ছুঁয়ে যান লাইলি খালা।

স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা মনে করছেন, সমাজের আড়ালে এখনও অনেক প্রতিভাবান মানুষ রয়েছেন, যাদের সামনে আনার সুযোগ খুব কম। লাইলি খালার ভাইরাল হওয়া ঘটনা সেই অবহেলিত প্রতিভাগুলোকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

জীবনের নানা অভাব-অভিযোগ আর অবহেলার মাঝেও লাইলি খালা যেন আবারও প্রমাণ করলেন—সত্যিকারের শিল্প ও প্রতিভা কখনও হারিয়ে যায় না।